সরকারি চাকরির বাজারে কিছু পদ থাকে যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কৌতূহল কাজ করে, কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই সেই পদগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান না। এমনই একটি পদ হলো “সার্টিফিকেট পেশকার”। আপনি হয়তো ডিসি অফিস বা ইউএনও অফিসে গিয়েছেন এবং ফাইলের স্তূপের পেছনে একজন ব্যস্ত মানুষকে দেখেছেন, কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন- সার্টিফিকেট পেশকার কি কাজ করে বা তারা আসলে সারাদিন অফিসে বসে কি কি কাজ করেন? চলুন, একদম গোড়া থেকে জেনে নিই সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি, তাদের প্রতিদিনের দায়িত্ব এবং এই চাকরির বাস্তব চিত্র।
অনেকেই মনে করেন, পেশকার মানেই বোধহয় শুধু আদালতের নথিপত্র এদিক-সেদিক করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন সার্টিফিকেট পেশকার হলেন সরকারি রাজস্ব আদায়ের বিচারিক প্রক্রিয়ার ‘ব্যাকবোন’ বা মেরুদণ্ড। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এবং সরকারি অফিসের কার্যপ্রণালী পর্যবেক্ষণ করে আজ আমি আপনাদের সামনে এই পদের একদম ভেতরকার খবর তুলে ধরব। কোনো কঠিন বা ভারী শব্দ নয়, একদম সহজ ভাষায় জানাব সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ , তাদের প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ এবং এই চাকরির ভবিষ্যৎ। চলুন, একদম গোড়া থেকে শুরু করা যাক।

কাদের সার্টিফিকেট পেশকার বা Certificate Peshkar বলা হয়?
সহজ বাংলায় যদি বলি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (DC Office) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) কার্যালয়ে “জেনারেল সার্টিফিকেট শাখা” নামে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শাখা থাকে। এখানে মূলত সরকারের পাওনা টাকা (যেমন কৃষি ঋণ, ভ্যাট, জলমহাল ইজারা বা অন্য কোনো বকেয়া) আদায়ের জন্য মামলা চলে। এই মামলাগুলো পরিচালনার জন্য যিনি বিচারক বা সার্টিফিকেট অফিসারকে (GCO) দাপ্তরিক ও নথিপত্র সংক্রান্ত কাজে সহায়তা করেন, তিনিই হলেন সার্টিফিকেট পেশকার। অথবা এই অফিসের অন্য শাখাতেও সার্টিফিকেট পেশকারের পোস্টিং হয়ে থাকে।
আরো পড়ুনঃ সরকারি অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের কাজ কি
তাকে আপনি বিচারকের ডান হাত বলতে পারেন। বিচারক রায় দেন ঠিকই, কিন্তু সেই রায়ের প্রেক্ষাপট তৈরি করা, নথি সাজানো এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি কাঠামোতে দাঁড় করানোর মূল কারিগর হলেন এই পেশকার।
সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি? (Certificate Peshkar Job Responsibilities)
বাস্তবে দেখলে বোঝা যায়, সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি—তা শুধু ফাইল টানাটানি নয়, বরং পুরো রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া সচল রাখা। এটা এক কথায় উত্তর দেওয়ার মতো বিষয় নয়। তাদের কাজের পরিধি বেশ ব্যাপক। একজন পেশকারকে একই সাথে করণিক, আইনি সহকারী এবং জনসংযোগ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করতে হয়। আসুন, তাদের প্রধান কাজগুলো একটু গভীরে গিয়ে দেখি।

১. মামলার ফাইল প্রস্তুত ও উপস্থাপন
একজন সার্টিফিকেট পেশকারের দিনের শুরুটাই হয় ফাইল খোঁজাখুঁজি দিয়ে। প্রতিদিনের কার্যতালিকায় (Cause List) যেসব মামলা থাকে, সেগুলোর নথিপত্র রেকর্ড রুম বা আলমারি থেকে বের করতে হয়। প্রতিটি ফাইলে গত তারিখের আদেশ কী ছিল, আজ কী পদক্ষেপ নিতে হবে—তা দেখে ফাইলগুলো সিরিয়াল অনুযায়ী সার্টিফিকেট অফিসারের টেবিলে উপস্থাপন করা সার্টিফিকেট পেশকার এর প্রধান কাজ। একটি ভুল ফাইল পুরো দিনের বিচারিক কাজ এলোমেলো করে দিতে পারে।
২. ধারা-৭ নোটিশ জারি ও প্রসেস সার্ভিং
যখন কোনো ব্যাংক বা সংস্থা কারো বিরুদ্ধে টাকা অনাদায়ের মামলা করে, তখন প্রথমেই বিবাদীকে জানাতে হয়। পিডিআর অ্যাক্ট (PDR Act, 1913) অনুযায়ী এই জানানোটাকে বলে “ধারা-৭ নোটিশ”।
- সার্টিফিকেট পেশকার কি কাজ করে এখানে? তিনি নির্ভুলভাবে এই নোটিশটি লিখেন।
- অফিসারের স্বাক্ষর নেন।
- এরপর সেটি জারিকারক (Process Server) এর মাধ্যমে বিবাদীর ঠিকানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ঠিকানা ভুল হলে বা নোটিশ ফেরত এলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটাও তাকেই ঠিক করতে হয়।
৩. আদেশনামা বা অর্ডার শিট লেখা
এটি সার্টিফিকেট পেশকার এর দায়িত্ব গুলোর মধ্যে সবচেয়ে টেকনিক্যাল কাজ। শুনানির সময় অফিসার মৌখিকভাবে যে নির্দেশ দেন (যেমন: “আগামী তারিখে শুনানি হবে” বা “ওয়ারেন্ট ইস্যু করো”), পেশকারকে সেটি আইনি ভাষায় আদেশনামায় লিখে ফেলতে হয়। এখানে ভুল করার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এই লিখিত আদেশের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। হাতের লেখা সুন্দর হওয়া এখানে বাড়তি সুবিধা দেয়।
৪. ওয়ারেন্ট ইস্যু ও তদারকি
টাকা না দিলে বা হাজির না হলে দেনাদারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা (Arrest Warrant) বা মালামাল ক্রোকের পরোয়ানা (Distress Warrant) জারি করতে হয়।
- পেশকার এই ওয়ারেন্ট ফরম পূরণ করেন।
- পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেটি পাঠান।
- ওয়ারেন্ট তামিল হলো কি না, তার রিপোর্ট সংগ্রহ করে নথিতে যুক্ত করেন।
৫. দৈনিক কার্যতালিকা তৈরি
আদালতের বাইরে নোটিশ বোর্ডে বা দরজায় আজকের মামলার তালিকা টাঙানো থাকে। এটি তৈরি করা সার্টিফিকেট পেশকার চাকরির কাজ। কোন মামলাটি কখন শুনানি হবে, তা এতে লেখা থাকে যাতে বিচারপ্রার্থীরা ভোগান্তিতে না পড়েন।
অফিসভেদে সার্টিফিকেট পেশকারের বেতন কত? (Certificate Peshkar Salary)
অফিসভেদে সার্টিফিকেট পেশকার (Certificate Peshkar) পদটি সাধারণত ১৬তম গ্রেডের চাকরি। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী ১৬তম গ্রেডে মূল বেতন শুরু হয় প্রায় ৯,৩০০ টাকা থেকে এবং ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে।
তবে শুধু মূল বেতনই আসল বিষয় না। এর সাথে যোগ হয় বিভিন্ন সরকারি ভাতা, যেমন—
- বাড়িভাড়া ভাতা
- চিকিৎসা ভাতা
- যাতায়াত ভাতা
- উৎসব ভাতা (ঈদ/দুর্গাপূজা)
এই ভাতাগুলো যুক্ত হলে একজন সার্টিফিকেট পেশকারের মাসিক মোট বেতন সাধারণত ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
গ্রাম বা উপজেলা পর্যায়ের অফিসে বেতন একটু কম হয়, আর জেলা শহর বা গুরুত্বপূর্ণ অফিসে হলে ভাতার কারণে কিছুটা বেশি পাওয়া যায়।
অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যায়, ফলে বেতন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। যদিও এটি উচ্চ বেতনের পদ নয়, তবুও চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত আয় এবং সরকারি সুবিধার কারণে অনেকেই এই পদে আগ্রহী হন।
সার্টিফিকেট পেশকার হিসেবে কি করতে হয়:
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য আসুন একজন পেশকারের একদিনের কাজের রুটিন দেখি:
- সকাল ৯:০০ – ১০:০০: অফিসে প্রবেশ। আলমারি খুলে আজকের শুনানির ৩০-৪০টি ফাইল বের করা। বিচারকের আসার আগেই টেবিলে ফাইলগুলো গুছিয়ে রাখা।
- সকাল ১০:০০ – ১:০০: এজলাস চলাকালীন সময়। বাদীর হাজিরা নেওয়া, বিবাদীর সময় প্রার্থনা মঞ্জুর বা নামঞ্জুর করা, এবং বিচারকের নির্দেশমতো তাৎক্ষণিক নোট নেওয়া। এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি প্রেশার থাকে।
- দুপুর ২:০০ – ৪:০০: শুনানির পর এবার ডেস্কে বসে কাজ। যেসব মামলায় রায় হয়েছে সেগুলোর আদেশ লেখা। নতুন আসা মামলাগুলো রেজিস্টারে এন্ট্রি দেওয়া।
- বিকেল ৪:০০ – ৫:০০: আগামীকালের জন্য ফাইল রেডি করা এবং জারিকারকদের বুঝিয়ে দেওয়া কোন নোটিশ কোথায় যাবে।
বুঝতেই পারছেন, সার্টিফিকেট পেশকার ডিউটি কি—এটা আসলে বিরামহীন এক কর্মযজ্ঞ।
আরো পড়ুনঃ প্রতিটি সরকারি অফিসে কার্য সহকারীর কাজ কি কি থাকে?
সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ বাংলায় (Certificate Peshkar job description in Bangla):
কাজের সুবিধার্থে বা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ বাংলায় নিচে পয়েন্ট আকারে দেওয়া হলো। এগুলো মনে রাখলে ভাইভা বা লিখিত পরীক্ষায় উত্তর দেওয়া সহজ হবে:
রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণ:
রেজিস্টার-৯ (মামলা দায়ের রেজিস্টার), রেজিস্টার-১০ (আদায় রেজিস্টার) সহ প্রায় ১২-১৪ ধরনের রেজিস্টার আপ-টু-ডেট রাখা।
কোর্ট ফি যাচাই:
মামলার আবেদনে সঠিক মানের কোর্ট ফি স্ট্যাম্প লাগানো হয়েছে কি না তা চেক করা। কম থাকলে তা বাদীকে দিয়ে পূরণ করানো।
নিলাম কার্যক্রম:
যদি কোনো সম্পত্তি ক্রোক করে নিলামে তোলার আদেশ হয়, তবে সেই নিলামের ইশতেহার তৈরি করা এবং মাইকিং বা পত্রিকায় বিজ্ঞপন দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
রিপোর্ট প্রদান:
মাস শেষে কত টাকা আদায় হলো এবং কয়টি মামলা নিষ্পত্তি হলো, তার পরিসংখ্যান তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো।
রেকর্ড রুমের সাথে যোগাযোগ:
পুরনো বা নিষ্পত্তি হওয়া মামলা রেকর্ড রুমে (মহাফেজখানা) বুঝিয়ে দেওয়া এবং সেখান থেকে রিসিভ কপি নিয়ে রাখা।
সার্টিফিকেট পেশকার মানে কি এবং কেন এই পদ গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, সার্টিফিকেট পেশকার মানে কি?
সহজ কথায়, “সার্টিফিকেট” শব্দটি এখানে ১৯১৩ সালের ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ (Public Demands Recovery Act) এর আওতায় দায়েরকৃত দাবিকে বোঝায়। আর “পেশকার” শব্দটি ফার্সি, যার অর্থ ‘উপস্থাপক’। অর্থাৎ, সার্টিফিকেট পেশকার হলেন তিনি, যিনি সরকারি পাওনা আদায়ের দাবি বা সার্টিফিকেট মামলাগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারকের সামনে পেশ করেন এবং নথিভুক্ত করেন।
এই পদটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব অনাদায়ী থাকে। এই টাকা আদায়ের চাবিকাঠি থাকে সার্টিফিকেট আদালতের হাতে। আর সেই আদালতের চাকা সচল রাখেন একজন পেশকার। তিনি যদি ঠিকমতো নোটিশ জারি না করেন বা ফাইলে ভুল তথ্য দেন, তবে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হবে। তাই এটি শুধু চাকরি নয়, দেশসেবার একটি অংশও বটে।
সার্টিফিকেট পেশকার চাকরির কাজ ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা
আপনি যদি এই পেশায় আসতে চান, তবে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা যথেষ্ট নয়। সার্টিফিকেট পেশকার চাকরির কাজ সুচারুভাবে করার জন্য কিছু বিশেষ দক্ষতা (Skills) আপনার থাকা চাই:
টাইপিং স্পিড:
এখন সব অফিস ই-নথি বা ডিজিটাল সিস্টেমে চলে যাচ্ছে। তাই বাংলা ও ইংরেজি টাইপিংয়ে ভালো গতি থাকা আবশ্যক। বিশেষ করে বাংলা টাইপিংয়ে ভুল করা চলবে না।
ধৈর্য ও জনসংযোগ:
প্রতিদিন নানা ধরণের মানুষের সাথে কথা বলতে হয়—কেউ রাগী, কেউ নাছোড়বান্দা। মাথা ঠান্ডা রেখে তাদের হ্যান্ডেল করা সার্টিফিকেট পেশকার এর দায়িত্ব এর মধ্যে পড়ে।
আইনের সাধারণ জ্ঞান:
পিডিআর আইন, দেওয়ানি কার্যবিধি (CPC) এবং তামাদি আইন সম্পর্কে বেসিক ধারণা থাকলে কাজ করা অনেক সহজ হয়ে যায়। আপনাকে উকিল হতে হবে না, তবে আইনের ভাষা বুঝতে হবে।
ফাইল ম্যানেজমেন্ট:
হাজার হাজার ফাইলের মধ্যে থেকে মুহূর্তের মধ্যে নির্দিষ্ট কাগজটি খুঁজে বের করার দক্ষতা থাকতে হবে।
বেতন, পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা:
অনেকেই সরকারি চাকরির পে-স্কেল নিয়ে কনফিউশনে থাকেন। আসুন, খোলাখুলি আলোচনা করি।

বেতন কাঠামো:
এই পদটি জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ১৬তম গ্রেড ভুক্ত।
- মূল বেতন (Basic): ৯,৩০০ টাকা।
- এর সাথে যোগ হবে: বাড়ি ভাড়া (এলাকাভেদে ৪৫%-৬৫%), চিকিৎসা ভাতা (১৫০০ টাকা), টিফিন ভাতা, এবং যাতায়াত ভাতা।
- সব মিলিয়ে চাকরির শুরুতে হাতে পাবেন প্রায় ১৮,০০০ থেকে ১৯,০০০ টাকা।
পদোন্নতি (Promotion):
সত্যি বলতে, এই পদে প্রমোশনের গতি কিছুটা ধীর। একজন সার্টিফিকেট পেশকার দীর্ঘ দিন একই পদে থাকেন। তবে অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পরবর্তীতে:
- সার্টিফিকেট সহকারী (Certificate Assistant)
- অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক
- এমনকি প্রধান সহকারী (Head Assistant) পদেও যাওয়ার সুযোগ থাকে। এর জন্য বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস করতে হয়।
অন্যান্য সুবিধা:
- জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কাজ করার সুবাদে স্থানীয় প্রশাসনে ভালো পরিচিতি ও সম্মান পাওয়া যায়।
- চাকরি শেষে পেনশন ও গ্র্যাচুইটি সুবিধা তো থাকছেই।
সার্টিফিকেট পেশকার বনাম আদালতের পেশকার এর মধ্যে পার্থক্য?
অনেকে জজ কোর্টের পেশকার আর ডিসি অফিসের সার্টিফিকেট পেশকারকে গুলিয়ে ফেলেন। দুজনেই পেশকার, কিন্তু কাজের ধরণ আলাদা:
| বিষয় | সার্টিফিকেট পেশকার | বিচারিক আদালতের (Judicial) পেশকার |
|---|---|---|
| আইন | পিডিআর অ্যাক্ট ১৯১৩ অনুযায়ী কাজ করেন। | দেওয়ানি বা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কাজ করেন। |
| মামলার ধরণ | শুধু টাকা আদায় সংক্রান্ত (লোন, ভ্যাট)। | জমিজমা, খুন, চুরি, ডিভোর্স সব ধরণের মামলা। |
| কর্তৃপক্ষ | জেলা প্রশাসক বা ইউএনও (নির্বাহী বিভাগ)। | জেলা জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট (বিচার বিভাগ)। |
| কাজের চাপ | তুলনামূলক নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে। | অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং জটিল। |
সার্টিফিকেট পেশকার হিসেবে সফল হওয়ার টিপস
আপনি যদি সদ্য এই চাকরিতে জয়েন করে থাকেন বা জয়েন করার কথা ভাবছেন, তবে এই টিপসগুলো আপনার ক্যারিয়ার বদলে দিতে পারে:

“PDR Manual” মুখস্থ রাখুন:
অফিসের টেবিলে সবসময় পিডিআর ম্যানুয়ালের একটি কপি রাখুন। কোনো কনফিউশন হলেই বই খুলে দেখে নিন।
সিনিয়রদের সম্মান:
এই কাজে হাতে-কলমে শেখার কোনো বিকল্প নেই। আপনার সিনিয়র বা বড়বাবুরাই আপনার আসল গুরু। তাদের থেকে কাজ শিখে নিন।
সততা বজায় রাখুন:
এই সেকশনে টাকার লেনদেন হয় বলে অনেক প্রলোভন আসতে পারে। মনে রাখবেন, সরকারি চাকরিতে সততাই আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। বিপদে পড়লে এই সততাই আপনাকে বাঁচাবে।
লিসেনিং পাওয়ার:
বিচারক বা অফিসার কী বলছেন, তা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস করুন। আদেশে ভুল লিখলে পুরো দায় আপনার ওপর আসবে।
সার্টিফিকেট পেশকার সম্পর্কিত সব প্রশ্নের উত্তর
১. সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি মেয়েদের জন্য উপযুক্ত?
অবশ্যই। বর্তমানে অনেক নারী ডিসি অফিস ও ইউএনও অফিসে সার্টিফিকেট পেশকার হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। এটি সম্পূর্ণ অফিসিয়াল ডেস্ক জব, তাই নারীদের জন্য এটি নিরাপদ এবং সম্মানজনক।
২. এই চাকরিতে কি অনেক কাজের চাপ থাকে?
সরকারি চাকরির মধ্যে এটি বেশ ব্যস্ত একটি পদ। বিশেষ করে জুনে অর্থবছর শেষের দিকে এবং অডিট চলাকালীন সময়ে কাজের চাপ বাড়ে। তবে অভ্যস্ত হয়ে গেলে এটি রুটিন মাফিক মনে হবে।
৩. নিয়োগ পরীক্ষায় কী ধরণের প্রশ্ন আসে?
সাধারণত বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং সাধারণ জ্ঞানের ওপর ৭০-৮০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয়।
- বাংলায়: এক কথায় প্রকাশ, বাগধারা, শুদ্ধিকরণ।
- ইংরেজিতে: Translation, Preposition, Paragraph.
- গণিতে: ঐকিক নিয়ম, শতকরা, সুদকষা (ক্লাস এইট-নাইন লেভেল)।
৪. সার্টিফিকেট মামলা নিষ্পত্তি হতে কত দিন লাগে?
এটি নির্ভর করে মামলার জটিলতার ওপর। কিছু মামলা ২-৩ শুনানিতেই শেষ হয়, আবার জটিল ক্ষেত্রে বছরের পর বছর চলতে পারে। এখানে পেশকারের দক্ষতা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে সাহায্য করে।
৫. বদলির সুযোগ আছে কি?
সাধারণত ডিসি অফিসের কর্মচারীদের নিজ জেলার মধ্যেই বদলি করা হয়। তবে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বা পদোন্নতি হলে অন্য উপজেলায় বদলি হতে পারে।
৬. সার্টিফিকেট পেশকার হিসেবে কি কি সফটওয়্যার জানা লাগে?
মাইক্রোসফট ওয়ার্ড (MS Word) এবং এক্সেল (Excel) জানাই যথেষ্ট। বিশেষ করে এক্সেলে হিসাব রাখাটা জানলে কাজ অনেক দ্রুত হয়।
৭. শিক্ষাগত যোগ্যতা কী লাগে?
আগে এইচএসসি পাস ছিল, তবে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে স্নাতক (Degree/Honors) চাওয়া হয়। সার্কুলারটি ভালো করে দেখে নেওয়া উচিত।
৮. সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি শুধু ফাইল টানাটানি?
একেবারেই না। ফাইলের ভেতরের তথ্য বিশ্লেষণ করা, আইনের ধারা মিলিয়ে দেখা এবং সঠিক ড্রাফটিং করা—এগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ।
৯. এই পদে জয়েন করলে কি কম্পিউটার দেবে?
হ্যাঁ, এখন প্রায় সব সার্টিফিকেট সেকশনেই কম্পিউটার ও প্রিন্টার দেওয়া হয়েছে। হাতের লেখার দিন প্রায় শেষ।
১০. পেশকার আর বেঞ্চ সহকারী কি এক?
অনেকটা একই ধরণের কাজ হলেও পদবী ভিন্ন। বেঞ্চ সহকারী সাধারণত ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কাজ করেন, আর সার্টিফিকেট পেশকার শুধুমাত্র সার্টিফিকেট আদালতে কাজ করেন।
১১. সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি এবং কেন এই পদ গুরুত্বপূর্ণ?
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি—এটা কেবল একটি ৯টা-৫টার ডিউটি নয়। এটি একটি দায়িত্ব, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থা সচল রাখতে সাহায্য করে। আপনি যদি পরিশ্রমী হন, মানুষকে আইনি সহায়তা দিয়ে মানসিক তৃপ্তি পেতে চান এবং সরকারি চাকরির নিরাপত্তা খুঁজছেন, তবে এই পদটি আপনার জন্য একটি চমৎকার ক্যারিয়ার অপশন হতে পারে।
কাজের চাপ থাকবেই, কিন্তু দিনশেষে যখন দেখবেন আপনার করা নোটিশ বা ওয়ারেন্টের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা সরকারি টাকা আদায় হয়েছে, তখন নিজের প্রতি একটা গর্ববোধ কাজ করবে। তাই যারা এই পেশায় আসতে চান, তারা ভালো করে প্রস্তুতি নিন। টাইপিং প্র্যাকটিস করুন এবং সাধারণ জ্ঞানে নিজেকে শানিয়ে নিন।
আপনার ক্যারিয়ার বা এই পদ সম্পর্কে আরও কিছু জানার থাকলে আমাদের ওয়েবসাইট Daily ICT Post ভিজিট করতে পারেন। সেখানে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে আরও অনেক টিপস ও ট্রিকস পাবেন।
আশা করি এই বিস্তারিত আলোচনা থেকে আপনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছেন সার্টিফিকেট পেশকার এর কাজ কি এবং এই পদটি কেন সরকারি প্রশাসনে এত গুরুত্বপূর্ণ।
