আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে যে ট্রেনটি ঝড়ের বেগে ছুটে চলে, তার চাকাগুলো ঠিক আছে কিনা তা কে নিশ্চিত করে? কিংবা ব্রেকটা ঠিক সময়ে কাজ করবে তো? আমরা যখন ট্রেনের সিটে গা এলিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিই, ঠিক তখনই স্টেশনের আবছা আলোয় কেউ একজন হাতুড়ি হাতে ট্রেনের নিচে ঢুকে শেষবারের মতো পরীক্ষা করে দেখছেন সবকিছু।
রেলওয়ের এই নেপথ্যের নায়কদেরই বলা হয় ট্রেন এক্সামিনার বা TXR। অনেকেই রেলওয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন ঠিকই, কিন্তু ট্রেন এক্সামিনার এর কাজ কি বা এই চাকরির বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। ইতিমধ্যে রেলওয়ে বিভাগের নিয়গ বিজ্ঞপ্তির আলোকে চাকরির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
আজকের এই ব্লগে আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করব এই পেশার একেবারে ভেতরের কথা। পুঁথিগত সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে জানব বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেন এক্সামিনার এর কাজ, তাদের প্রতিদিনকার চ্যালেঞ্জ, এবং ক্যারিয়ার হিসেবে এটি কতটা সম্ভাবনাময়। চলুন, রেললাইনের ধারে তাদের কর্মজগৎ থেকে একটু ঘুরে আসি।

ট্রেন এক্সামিনার বা TXR আসলে কে?
সহজ বাংলায় বলতে গেলে, ট্রেন এক্সামিনার হলেন ট্রেনের ‘ফিটনেস ডাক্তার’। রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের (C&W – Carriage and Wagon) অধীনে তারা কাজ করেন। ডাক্তার যেমন রোগী না দেখা পর্যন্ত ওষুধ দেন না, তেমনি একজন ট্রেন এক্সামিনার বা TXR ‘ফিট’ ঘোষণা না করা পর্যন্ত স্টেশনের মাস্টার ট্রেন ছাড়ার অনুমতি দিতে পারেন না।
একটি ট্রেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে কিনা, তার পুরো দায়ভার থাকে মূলত এই ব্যক্তির কাঁধেই। তাই এই পদটি যতটা সম্মানের, ঠিক ততটাই দায়িত্বের।
ট্রেন এক্সামিনার এর কাজ কি?
বইয়ের ভাষায় হয়তো অনেক দায়িত্বের কথা লেখা থাকে, কিন্তু বাস্তবে ট্রেন এক্সামিনার পদের কাজ ও দায়িত্ব আরও অনেক ব্যাপক এবং প্র্যাকটিক্যাল। চলুন, ধাপে ধাপে জেনে নিই একজন ট্রেন এক্সামিনারকে আসলে কী কী করতে হয়।
১. ট্রেনের ফিটনেস চেকআপ (রোলিং স্টক পরীক্ষা)
স্টেশনে ট্রেন ঢোকামাত্রই দেখবেন কিছু লোক বিশেষ ইউনিফর্ম পরে ট্রেনের চাকা ও নিচের অংশ পরীক্ষা করছেন। এটিই তাদের প্রধান কাজ। ট্রেনের চাকা, স্প্রিং, বা বগির নিচের কোনো যন্ত্রাংশ ভেঙে গেছে কিনা বা ক্ষয় হয়েছে কিনা, তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেখা। একে বলা হয় রোলিং স্টক মেইনটেইনেন্স।

২. ব্রেক পাওয়ার সার্টিফিকেট (BPC) ইস্যু করা
এটি এই চাকরির সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল অংশ। রেলওয়ে ট্রেন এক্সামিনার এর দায়িত্ব কী—এই প্রশ্নের এক কথায় উত্তর হলো ‘নিরাপদ ব্রেক নিশ্চিত করা’। ট্রেন ছাড়ার আগে তারা পরীক্ষা করেন যে ট্রেনের ব্রেকিং সিস্টেম শতভাগ কাজ করছে কিনা। সব ঠিক থাকলে তারা চালককে একটি লিখিত সার্টিফিকেট দেন, যাকে BPC বলা হয়। এই কাগজ ছাড়া ট্রেন এক ইঞ্চিও নড়বে না।
৩. এক্সেল বক্স ও হিট চেকিং
ট্রেন চলার সময় চাকার এক্সেল বা বিয়ারিং অতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে কিনা, তা হাত দিয়ে বা সেন্সর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। যদি কোনো চাকা ‘হট এক্সেল’ (অতিরিক্ত গরম) হয়ে যায়, তবে সেটি লাইনচ্যুত হওয়ার বা আগুন ধরার ঝুঁকি তৈরি করে। ট্রেন এক্সামিনার তাৎক্ষণিকভাবে ওই বগিটি ট্রেন থেকে আলাদা করার নির্দেশ দেন।
৪. পিট লাইনে ট্রেনের যত্ন (Pit Line Inspection)
লম্বা জার্নির পর ট্রেন যখন রেস্ট নিতে ওয়াশপিট বা পিট লাইনে যায়, তখন শুরু হয় ট্রেন এক্সামিনারের আসল কাজ। ট্রেনের নিচে নেমে (Undergear) প্রতিটি নাট-বল্টু, সেফটি চেইন, এবং হ্যাঙ্গার পরীক্ষা করা। এটি বেশ কষ্টসাধ্য কাজ কারণ এখানে কালি-ঝুলি মাখতে হয় এবং ট্রেনের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে কাজ করতে হয়।
৫. বগি বা কোচ বাতিল করা (Sick marking)
যদি পরীক্ষায় দেখা যায় কোনো বগি বা ওয়াগন যাত্রার জন্য নিরাপদ নয়, তবে সেটিকে ‘সিক’ (Sick) বা অসুস্থ ঘোষণা করা ট্রেন এক্সামিনার হিসেবে কী কী কাজ করতে হয় তার মধ্যে অন্যতম। এই বগিগুলোকে পরে সিক লাইনে নিয়ে মেরামত করা হয়।
৬. জরুরি মেরামত বা ট্রাবলশুটিং
মাঝপথে ট্রেনের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে, যেমন ভ্যাকুয়াম ড্রপ করা বা পাইপ লিক হওয়া, তখন এক্সামিনারকে দ্রুততম সময়ে তা ঠিক করতে হয়। যাত্রীদের বিরক্তি কমানো এবং ট্রেন সময়মতো ছাড়ার জন্য এখানে গতির সাথে কাজ করাটা খুব জরুরি।
কর্মক্ষেত্র ভেদে কাজের ধরণ: কোথায় কেমন ডিউটি?
বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেন এক্সামিনার এর কাজ সব জায়গায় একরকম নয়। আপনি কোথায় পোস্টিং পাচ্ছেন, তার ওপর আপনার ডিউটি নির্ভর করবে।
| ডিউটির ধরণ | কাজের বিবরণ |
|---|---|
| স্টেশন ডিউটি | প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামার পর দ্রুত চাকা ও ব্রেক চেক করা (Rolling In/Out)। |
| ইয়ার্ড ডিউটি | মালবাহী ট্রেনের ওয়াগনগুলো লোড করার আগে ও পরে চেক করা। |
| সিক লাইন ডিউটি | নষ্ট বগিগুলো ওয়ার্কশপে বা নির্দিষ্ট লাইনে রেখে মেরামত করা। |
| ব্রেক ভ্যান ডিউটি | মাঝে মাঝে বিশেষ প্রয়োজনে ট্রেনের সাথে ইঞ্জিনে বা পেছনের বগিতে ভ্রমণ করে নজরদারি করা। |
ট্রেন এক্সামিনারদের দৈনিক রুটিন
অনেকেই জানতে চান, এই চাকরিতে কি অফিস টাইমের মতো ডিউটি? উত্তর হলো—না। ট্রেন এক্সামিনার জব ডেসক্রিপশন বাংলায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি একটি শিফটিং ডিউটি।
- দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা: ট্রেন যেমন থামে না, এদের কাজও থামে না। সকাল, বিকেল বা গভীর রাত—তিনটি শিফটে কাজ করতে হয়।
- ওয়েদার চ্যালেঞ্জ: বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হোক কিংবা প্রচণ্ড রোদ, ট্রেন এক্সামিনারকে ছাতা মাথায় বা রেইনকোট পরেই লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। এসি রুমের আরাম এখানে নেই।
- টিম লিডিং: একজন এক্সামিনারের অধীনে বেশ কয়েকজন ফিটার, খালাসি এবং গ্যাংম্যান কাজ করেন। তাদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া এবং তদারকি করাও ট্রেন এক্সামিনার ডিউটি ও কার্যাবলি-র অংশ।
ট্রেন এক্সামিনার পদের সুযোগ-সুবিধা
সরকারি চাকরি হিসেবে এটি বেশ লোভনীয়। ট্রেন এক্সামিনার পদে কর্মরতদের কাজ কী, তা তো জানলেন, এবার চলুন জানি এর সুযোগ-সুবিধাগুলো।

১. বেতন ও পদমর্যাদা
সাধারণত এটি ১২তম গ্রেডের চাকরি। তবে রেলওয়েতে ‘মাইলেজ’ বা ওভারটাইম সুবিধা থাকায় মাস শেষে বেতনের অংকটা বেশ ভালোই দাঁড়ায়। মূল বেতনের সাথে টিফিন ভাতা, ঝুঁকি ভাতা এবং যাতায়াত ভাতা যোগ হয়।
২. প্রোমোশন বা পদোন্নতি
একজন দক্ষ TXR সময়ের সাথে সাথে পদোন্নতি পেয়ে ‘হেড ট্রেন এক্সামিনার’ এবং পরবর্তীতে ‘সিনিয়র সেকশন ইঞ্জিনিয়ার’ (SSE) পর্যন্ত হতে পারেন। সেকশন ইঞ্জিনিয়ার পদটি রেলওয়েতে অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং সম্মানের।
৩. ভ্রমণের সুবিধা
রেলওয়ের কর্মী হিসেবে আপনি এবং আপনার পরিবার নির্দিষ্ট সংখ্যক ফ্রি পাস বা প্রিভিলেজ টিকেট পাবেন, যা দিয়ে সারা দেশ ভ্রমণ করা সম্ভব।
এই পেশায় আসার আগে যে গুণগুলো থাকা জরুরি
শুধুমাত্র সার্টিফিকেট থাকলেই ভালো ট্রেন এক্সামিনার হওয়া যায় না। রেলওয়ে ট্রেন এক্সামিনার চাকরির কাজ ঠিকঠাক করতে হলে আপনার মধ্যে কিছু বিশেষ গুণ থাকতে হবে:
তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা: হাজার হাজার যন্ত্রাংশের ভিড়ে একটি ছোট ফাটল বা লুজ নাট খুঁজে বের করার মতো ‘ঈগলের চোখ’ থাকতে হবে।
শারীরিক ফিটনেস: ট্রেনের নিচে ঢোকা, ওঠানামা করা এবং ভারী যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করার জন্য ভালো স্ট্যামিনা প্রয়োজন।
দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ: ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে, কিন্তু আপনি একটি ত্রুটি পেলেন। এই মুহূর্তে ট্রেন আটকাবেন নাকি মেরামত করবেন—এই সিদ্ধান্ত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিতে হয়।
ধৈর্য ও সাহসিকতা: রাতের অন্ধকারে নির্জন ইয়ার্ডে কাজ করার সাহস এবং মানসিক শক্তি থাকা চাই।
উপসংহার:
পরিশেষে, ট্রেন এক্সামিনার এর কাজ কি এটা শুধু যান্ত্রিক কোনো ডিউটি নয়, এটি একটি সেবামূলক কাজ। আপনার একটি সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে শত শত মানুষের জীবন। আপনি যদি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন, গতানুগতিক ডেস্ক জবের বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান এবং রেলগাড়ি ভালোবাসেন, তবে এই চাকরিটি আপনার জন্যই।
এখানে কাজের চাপ আছে, রোদে পোড়া বা বৃষ্টিতে ভেজার কষ্ট আছে, কিন্তু দিনশেষে যখন আপনার চেক করা ট্রেনটি নিরাপদে যাত্রীদের নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যায়, সেই তৃপ্তিটুকু অমূল্য।
আরও বিস্তারিত জানতে এবং রেলওয়ের অন্যান্য টেকনিক্যাল পোস্ট সম্পর্কে পড়তে ভিজিট করতে পারেন আমাদের Daily ICT Post ওয়েবসাইটে।
ট্রেন এক্সামিনার সংক্রান্ত প্রশ্ন ও উত্তর
পাঠকদের মনে এই পদ নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে। চলুন, সবচেয়ে কমন ট্রেন এক্সামিনার সংক্রান্ত ১০টি প্রশ্নের সহজ উত্তর জেনে নিই।
১. ট্রেন এক্সামিনার হতে গেলে কী শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে?
সাধারণত মেকানিক্যাল বা ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অথবা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস চাওয়া হয়। তবে সার্কুলার ভেদে এটি ভিন্ন হতে পারে, তাই মূল বিজ্ঞপ্তি দেখা জরুরি।
২. মেয়েদের জন্য কি এই চাকরি উপযুক্ত?
রেলওয়েতে নারী ট্রেন এক্সামিনাররাও কাজ করছেন। তবে এটি যেহেতু ফিল্ড ওয়ার্ক এবং শিফটিং ডিউটি, তাই অনেক নারীই এটিকে চ্যালেঞ্জিং মনে করেন। তবে সাহসিকতার সাথে মেয়েরাও এখন এই পদে ভালো করছেন।
৩. এই চাকরিতে কি ঘুষ নেওয়ার সুযোগ আছে?
দুর্নীতি ব্যক্তিগত সততার বিষয়। তবে ট্রেন এক্সামিনারের কাজ সরাসরি নিরাপত্তার সাথে জড়িত। এখানে অনৈতিক কিছু করলে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে, তাই এখানে সততাই একমাত্র পথ।
৪. ট্রেনিং পিরিয়ড কতদিনের হয়?
চাকরি পাওয়ার পর সাধারণত ২ থেকে ৪ বছরের একটি কঠোর ট্রেনিং পিরিয়ড থাকে (শিক্ষানবিশ কাল), যেখানে হাতে-কলমে কাজ শেখানো হয়।
৫. TXR এবং লোকো মাস্টার (Driver) কি একই?
না। লোকো মাস্টার ট্রেন চালান, আর TXR ট্রেনের যান্ত্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করেন। TXR ফিটনেস না দিলে লোকো মাস্টার ট্রেন চালাতে পারবেন না।
৬. নাইট ডিউটি কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, রেলওয়ে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে। তাই রস্টার অনুযায়ী আপনাকে মাসে বেশ কয়েকদিন নাইট ডিউটি করতেই হবে।
৭. চশমা থাকলে কি আবেদন করা যায়?
দৃষ্টিশক্তি ভালো হওয়া জরুরি। তবে পাওয়ার চশমা ব্যবহার করে যদি দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক থাকে (কালার ব্লাইন্ডনেস ছাড়া), তবে সাধারণত সমস্যা হয় না। মেডিকেল টেস্টে এটি যাচাই করা হয়।
৮. পোস্টিং কি নিজ জেলায় পাওয়া সম্ভব?
সরকারি চাকরিতে পোস্টিং কর্তৃপক্ষের হাতে। তবে রেলওয়ের জোন (পূর্ব বা পশ্চিম) অনুযায়ী এবং শূন্য পদ থাকলে নিজ এলাকার কাছাকাছি পোস্টিং পাওয়া যেতে পারে।
৯. এই কাজের প্রধান ঝুঁকি কী?
চলন্ত ট্রেন বা লাইনের পাশে কাজ করতে হয় বলে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। একটু অসাবধান হলেই বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
১০. রেলওয়ের কোয়ার্টার সুবিধা পাওয়া যায় কি?
বেশিরভাগ বড় স্টেশনে বা জংশনে রেলওয়ের নিজস্ব কোয়ার্টার থাকে। সিনিয়রিটি এবং খালি থাকা সাপেক্ষে আপনি থাকার জন্য কোয়ার্টার পেতে পারেন।
Please don’t forget to leave a review of my article.
