ভোট দেওয়া কেবল একটি অধিকার নয়, ইহা আমাদের নাগরিক ক্ষমতার প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচনের দিন সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে হাতে কালি লাগিয়ে ভোট দেওয়ার আনন্দই আলাদা। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে, চাকরির খাতিরে বা সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য অনেক সময় আমরা যারা সরকারি চাকরি করি তাঁদের নিজ এলাকা বা ভোটকেন্দ্র থেকে শত শত মাইল দূরে থাকতে হয়। তখন মনের মধ্যে একটা আক্ষেপ কাজ করে- “ইশ! এবার মনে হয় ভোটটা দিতে পারলাম না।”
কিন্তু আপনি কি জানেন? আপনার এই সমস্যার একটি অসাধারণ সমাধান রয়েছে। আপনাকে ভোট দিতে সশরীরে কেন্দ্রে উপস্থিত হতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। ডাকযোগে বা পোস্ট অফিসের মাধ্যমেও আপনি আপনার মূল্যবান ভোটটি প্রদান করতে পারেন। এই পদ্ধতিটিই হলো ‘পোস্টাল ব্যালট’।
আজকের এই পোস্টে আমরা জানব পোস্টাল ব্যালট এর মাধ্যমে দূরে থেকে ভোট দেওয়ার উপায়, কারা এই সুবিধা পাবেন, নতুন ডিজিটাল বা অ্যাপ-ভিত্তিক নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে এবং ভোটটি কাউন্ট হওয়া পর্যন্ত আপনাকে কী কী ধাপ পার করতে হবে। আপনি যদি সরকারি চাকরিজীবী, নির্বাচনী কর্মকর্তা বা আনসার-ভিডিপি সদস্য হয়ে থাকেন, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে।
চলুন, আর দেরি না করে মূল আলোচনায় আসি।

পোস্টাল ব্যালট কী?
পোস্টাল ব্যালট এর মাধ্যমে দূরে থেকে ভোট দেওয়ার উপায় জানার আগে, আমাদের পোস্টাল ব্যালট কী। খুব সহজ ভাষায় বললে, পোস্টাল ব্যালট হলো “ভোটের হোম ডেলিভারি সিস্টেম” এর উল্টোটা। অর্থাৎ, আপনি ভোটের দিন কেন্দ্রে যেতে পারবেন না, তাই নির্বাচন কমিশন আপনাকে ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠাবে, আর আপনি ঘরে বসেই সিল মেরে সেটা আবার ডাকযোগে ফেরত পাঠাবেন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ভোটারদের সশরীরে কেন্দ্রে উপস্থিত না হয়েও ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ইহা কোনো নতুন পদ্ধতি নয়, বরং উন্নত বিশ্বে ইহা খুবই জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও বহুদিন ধরে এই নিয়ম চালু আছে, তবে প্রচারের অভাবে এবং প্রক্রিয়াটি কিছুটা জটিল মনে হওয়ায় অনেকেই এই সুযোগ নিতেন না। কিন্তু বর্তমান যুগে, বিশেষ করে স্মার্টফোনের অ্যাপ আসার পর বিষয়টি এখন জলের মতো সহজ হয়ে গেছে।
পোস্টাল ব্যালট এর মাধ্যমে দূরে থেকে ভোট দেওয়ার উপায়:
এখন আমরা মূল অ্যাকশনে যাব। কীভাবে আপনি এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবেন? পুরো জার্নিটাকে আমরা দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি: (১) অনলাইন নিবন্ধন এবং (২) ব্যালট পেপার গ্রহণ ও প্রেরণ।
আপনার সুবিধার্থে প্রতিটি ধাপ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ধাপ-১: মোবাইল অ্যাপ ইন্সটল
প্রথমে আপনাকে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে অথবা নির্দিষ্ট ওয়েব পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। হাতের কাছে যা যা রাখবেন:
আপনার স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা এনআইডি নম্বর।
আপনার জন্ম তারিখ।
একটি সচল মোবাইল নম্বর (যেটি আপনার নিজের নামে নিবন্ধিত)।
আপনার কর্মস্থলের তথ্য।
ধাপ-২: সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন
অ্যাপে ঢোকার পর আপনি ঠিক সেই স্ক্রিনটি দেখতে পাবেন যা আপনি ছবিতে দেখিয়েছেন। এখানে তিনটি অপশন থাকবে।
আপনি যদি সরকারি চাকরিজীবী হন এবং কর্মস্থল ভোটার এলাকার বাইরে হয়, তবে প্রথম অপশনটি (iBAS++ নিবন্ধিত) সিলেক্ট করুন।
নির্বাচনী কর্মকর্তা হলে দ্বিতীয়টি।
আনসার সদস্য হলে তৃতীয়টি।
সঠিক বক্সে ক্লিক করার পর নিচে থাকা সবুজ রঙের “পরবর্তী” বাটনে চাপ দিন।
ধাপ-৩: পরিচয় যাচাইকরণ (Verification)
পরের ধাপে আপনাকে আপনার এনআইডি নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিতে বলা হবে। তথ্যগুলো দেওয়ার পর ‘যাচাই করুন’ বাটনে ক্লিক করলে সিস্টেম অটোমেটিক নির্বাচন কমিশনের সার্ভার থেকে আপনার তথ্য মিলিয়ে দেখবে।
এরপর আপনার মোবাইলে একটি ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) আসবে। এই কোডটি অ্যাপে বসালে আপনার ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হবে। এই ধাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইহা নিশ্চিত করে যে অন্য কেউ আপনার হয়ে আবেদন করছে না।
ধাপ-৪: ফর্ম পূরণ
ভেরিফিকেশনের পর আপনাকে কিছু অতিরিক্ত তথ্য দিতে হতে পারে। যেমন:
আপনার বর্তমান কর্মস্থলের পূর্ণ ঠিকানা (যেখানে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হবে)।
আপনার পদবী।
আপনি কোন নির্বাচনী এলাকার ভোটার (ইহা সাধারণত এনআইডি থেকে অটোমেটিক চলে আসে)।
সব তথ্য সঠিক থাকলে ‘সাবমিট’ বা ‘নিবন্ধন সম্পন্ন করুন’ বাটনে ক্লিক করুন। আপনার কাজ আপাতত শেষ! এখন বল নির্বাচন কমিশনের কোর্টে।
কেন পোস্টাল ব্যালট এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভেবে দেখুন, একজন পুলিশ অফিসার যিনি নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে আছেন, তিনি যদি ডিউটির কারণে নিজের ভোটটি দিতে না পারেন, তাহলে বিষয়টা কেমন দাঁড়াল? কিংবা একজন সরকারি কর্মকর্তা যিনি পরিবার ছেড়ে দূরবর্তী জেলায় কাজ করছেন। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা। ইহা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।
আগে পোস্টাল ব্যালটের জন্য আবেদন করতে হলে হাতে লেখা চিঠি নিয়ে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে দৌঁড়াতে হতো। সেই চিঠি ঠিক সময়ে পৌঁছাল কি না, তা নিয়েও থাকত সংশয়। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। নির্বাচন কমিশন (EC) এখন প্রযুক্তিবান্ধব।
সম্প্রতি চালু হওয়া অনলাইন পোর্টাল এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করা যাচ্ছে। আপনি যে স্ক্রিনশটটি (ছবি) শেয়ার করেছেন, সেটিই মূলত এই আধুনিক ব্যবস্থার প্রবেশদ্বার। এই অটোমেশনের ফলে এখন আর ফাইলের স্তূপে আপনার আবেদন হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। iBAS++ (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম) এর সাথে এই সিস্টেমটি যুক্ত থাকায়, আপনার পরিচয় মুহূর্তেই যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।
কারা এই সুবিধা পাবেন?
অনেকেই গুগলে সার্চ করেন “সবাই কি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবে?” উত্তর হলো—না, সবাই পারবে না। পোস্টাল ব্যালট এর মাধ্যমে দূরে থেকে ভোট দেওয়ার উপায় সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সুনির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির ভোটারদের জন্য এই সুযোগটি সংরক্ষিত রেখেছে।
আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রধানত ৩টি শ্রেণির মানুষ এই অ্যাপ বা পোর্টাল ব্যবহার করে আবেদন করতে পারবেন:
ক. নিজ ভোটার এলাকার বাইরে কর্মরত iBAS++ এ নিবন্ধিত সরকারি চাকরিজীবী
ইহা সবচেয়ে বড় একটি গ্রুপ। বিষয়টি একটু ভেঙে বলা যাক।
iBAS++ কী? ইহা সরকারের এমন একটি অনলাইন সফটওয়্যার, যার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং পেনশন ম্যানেজ করা হয়। আপনার বেতন যদি ইএফটি (EFT) এর মাধ্যমে ব্যাংকে ঢোকে, তার মানে আপনি iBAS++ এ আছেন।
শর্ত: শুধু সরকারি চাকরিজীবী হলেই হবে না। শর্ত হলো আপনাকে “নিজ ভোটার এলাকার বাইরে কর্মরত” হতে হবে।
উদাহরণ ১: জনাব রফিক একজন সরকারি স্কুল শিক্ষক। তার বাড়ি এবং কর্মস্থল দুটোই পাবনায়। তিনি কিন্তু পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন না। কারণ তিনি চাইলেই রিকশা বা হেঁটে কেন্দ্রে যেতে পারেন।
উদাহরণ ২: জনাব শফিক কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তার বাড়ি খুলনায় (তিনি সেখানকার ভোটার), কিন্তু তার পোস্টিং বা বর্তমান কর্মস্থল সিলেটে। তিনি এই সুযোগটি পাবেন। কারণ নির্বাচনের দিন ছুটি থাকলেও সিলেট থেকে খুলনা গিয়ে ভোট দেওয়া তার জন্য কষ্টসাধ্য।
খ. নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ
একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিশ্রম প্রয়োজন হয়। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, ম্যাজিস্ট্রেট, এবং নির্বাচনের দিন জরুরি সেবায় নিয়োজিত (যেমন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস কর্তৃপক্ষ) কর্মকর্তারা এর অন্তর্ভুক্ত।
যেহেতু নির্বাচনের দিন তাদের অন্য কোনো কেন্দ্রে বা কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাই তারা নিজের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান না। তাদের জন্যই এই ক্যাটাগরি।
গ. আনসার ও ভিডিপি সদস্য (iBAS++ এ নিবন্ধিত নন)
গ্রাম-বাংলায় নির্বাচনের নিরাপত্তায় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (VDP) সদস্যরা বিশাল ভূমিকা রাখেন। তাদের অনেকেই সরকারি ভাতার আওতায় থাকলেও সরাসরি iBAS++ সিস্টেমে বেতন পান না। তাদের কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করে এই অপশনটি রাখা হয়েছে। তারাও এখন অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই আবেদন করতে পারবেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এর বাইরেও প্রবাসী বাংলাদেশি এবং কারাগারে বন্দী কয়েদিদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের আইনগত বিধান রয়েছে, তবে বর্তমান অ্যাপের ইন্টারফেসে মূলত উপরের তিনটি ক্যাটাগরিকেই ফোকাস করা হয়েছে।
ব্যালট পেপার হাতে পাওয়ার পর কী করবেন?
অনলাইনে আবেদন করলেই কিন্তু ভোট দেওয়া হয়ে গেল না। পোস্টাল ব্যালট এর মাধ্যমে দূরে থেকে ভোট দেওয়ার উপায় এর আসল রোমাঞ্চ শুরু হয় এরপর। আপনার আবেদন মঞ্জুর হলে রিটার্নিং অফিসার আপনার দেওয়া ঠিকানায় একটি রেজিস্টার্ড খাম পাঠাবেন।
এই খামের ভেতর আপনি ৪টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাবেন:
ব্যালট পেপার: আসল ব্যালট পেপার, যেখানে প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক থাকবে।
ঘোষণাপত্র (Form 13): ইহা একটি আইনি কাগজ যেখানে আপনাকে স্বাক্ষর করে ঘোষণা দিতে হবে যে আপনিই সেই ভোটার।
ছোট খাম (Cover A): এর উপরে সাধারণত ‘Form 13B’ লেখা থাকে।
বড় খাম (Cover B): এর উপরে ‘Form 13C’ লেখা থাকে এবং রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা লেখা থাকে।
ভোট দেওয়ার নিয়ম
এই ধাপটি খুবই ক্রিটিক্যাল। এখানে ভুল করলে আপনার ভোট বাতিল হয়ে যেতে পারে।
স্টেপ ১: ভোট প্রদান
ব্যালট পেপারটি হাতে নিন। আপনার পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকের ওপর নির্ধারিত জায়গায় ‘ক্রস চিহ্ন’ (X) বা ‘টিক চিহ্ন’ (✓) দিন। মনে রাখবেন, কলম দিয়ে স্পষ্ট করে মার্ক করবেন। অন্য কোনো লেখা বা দাগ দেবেন না, এতে ব্যালট বাতিল হতে পারে।
স্টেপ ২: গোপনীয়তা রক্ষা
ভোট দেওয়ার পর ব্যালট পেপারটি ভাঁজ করুন এবং সেটিকে ছোট খামে (Cover A) ভরে আঠা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিন। এই ছোট খামের ওপর আপনার নাম বা কোনো চিহ্ন দেবেন না। ইহা আপনার ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করবে।
স্টেপ ৩: ঘোষণাপত্র ও সত্যায়ন (Attestation)
খামের সাথে আসা ঘোষণাপত্রটি (Form 13) পূরণ করুন। এখানে আপনার নাম, সিরিয়াল নম্বর এবং স্বাক্ষর থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ঘোষণাপত্রটি একজন গেজেটেড অফিসারের (প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা) দ্বারা সত্যায়িত করতে হবে। তিনি আপনার স্বাক্ষরের পাশে নিজের সিল ও স্বাক্ষর দেবেন এবং নিশ্চিত করবেন যে আপনিই সেই ব্যক্তি।
স্টেপ ৪: চূড়ান্ত খাম প্রস্তুতকরণ
এবার সেই ছোট খামটি (যার ভেতর ব্যালট আছে) এবং সত্যায়িত ঘোষণাপত্রটি—এই দুটো জিনিস একসাথে বড় খামটিতে (Cover B) ঢোকান। বড় খামের মুখ ভালোভাবে আঠা দিয়ে বন্ধ করুন।
স্টেপ ৫: প্রেরণ
বড় খামটির ওপর ইতিমধ্যেই রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা লেখা থাকার কথা। যদি না থাকে, তবে স্পষ্ট করে লিখুন। এবার ডাকযোগে (Post Office) খামটি পাঠিয়ে দিন। মনে রাখবেন, এর জন্য আপনাকে কোনো ডাকটিকিট লাগাতে হবে না; ইহা সাধারণত ‘সার্ভিস আনপেইড’ হিসেবে যায়, অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন এর খরচ বহন করে (তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্থানীয় ডাকঘরে জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো)।
কখন আবেদন করবেন এবং কখন পাঠাবেন?
পোস্টাল ব্যালট এর মাধ্যমে দূরে থেকে ভোট দেওয়ার উপায় জানার পাশাপাশি সময়ের গুরুত্ব বোঝা জরুরি। আপনি যদি নির্বাচনের আগের দিন আবেদন করেন, তবে কোনো লাভ হবে না।
আবেদনের সময়সীমা: সাধারণত নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচন কমিশন পোস্টাল ব্যালটের জন্য আবেদনের সময়সীমা জানিয়ে দেয়। আপনাকে সেই সময়ের মধ্যেই অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে। দেরি করলে সার্ভার বন্ধ হয়ে যাবে।
ব্যালট পাঠানোর সময়সীমা: আপনার পাঠানো খামটি অবশ্যই ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার সময়ের আগে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছাতে হবে। অর্থাৎ, নির্বাচনের দিন বিকেল ৪টা বা ৫টার মধ্যে (বা কমিশন নির্ধারিত সময়) খামটি তাদের হাতে পৌঁছাতে হবে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো হাতে ব্যালট পাওয়ার সাথে সাথেই ভোট দিয়ে পোস্ট করে দেওয়া। শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করবেন না।
কেন এই পদ্ধতিতে ভোট দেওয়া নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, “আমার ভোটটা কি আসলেই কাউন্ট হবে? নাকি মাঝপথে হারিয়ে যাবে?” এখানে বিশ্বাসযোগ্যতার (Trustworthiness) বিষয়টি আসে।
১. পৃথক গণনা: পোস্টাল ব্যালটগুলো সাধারণ ব্যালট বাক্সের সাথে মেশানো হয় না। ভোট গণনার সময় রিটার্নিং অফিসার প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে আলাদাভাবে এই খামগুলো খোলেন এবং গণনা করেন।
২. ডাবল চেকিং: যেহেতু আপনি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করছেন এবং একজন গেজেটেড অফিসার তা সত্যায়ন করছেন, তাই এখানে জালিয়াতির সুযোগ খুবই কম।
৩. iBAS++ ইন্টিগ্রেশন: অ্যাপের মাধ্যমে iBAS++ এর ডেটাবেস ব্যবহার করার ফলে ভুয়া ভোটার সেজে আবেদন করার কোনো সুযোগ নেই। ইহা পুরো প্রক্রিয়ার অথরিটি (Authoritativeness) এবং নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
৪. স্বচ্ছতা: আপনি চাইলে আমাদের ওয়েবসাইট https://dailyictpost.com-এ ভিজিট করে নির্বাচন সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত টিপস এবং আপডেট জেনে নিতে পারেন, যা আপনাকে পুরো প্রক্রিয়ায় আপডেট থাকতে সাহায্য করবে।
কি কি ভুলে আপনার ভোট বাতিল করতে পারে
আমরা চাই না এত কষ্ট করার পর আপনার ভোটটি বাতিল হোক। তাই নিচের ভুলগুলো থেকে সাবধান থাকুন:
সত্যায়ন না করা: আপনি যদি ঘোষণাপত্রটি (Form 13) কোনো গেজেটেড অফিসারকে দিয়ে সত্যায়িত না করেন, তবে আপনার ভোট সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। ইহা সবচেয়ে বড় ভুল যা মানুষ করে।
দেরিতে পাঠানো: নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর আপনার চিঠি পৌঁছালে তা আর খোলাও হবে না।
ভুল খামে ব্যালট: ব্যালট পেপারটি ছোট খামে না ভরে সরাসরি বড় খামে বা ঘোষণাপত্রের সাথে স্ট্যাপল করে দিলে গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার কারণে ভোট বাতিল হতে পারে।
অস্পষ্ট মার্কিং: প্রতীকের ওপর এমনভাবে দাগ দিলেন যে বোঝা যাচ্ছে না আপনি কাকে ভোট দিয়েছেন, অথবা একাধিক প্রতীকে দাগ দিয়ে ফেললেন।
পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা ও অসুবিধা
যেকোনো ব্যবস্থারই ভালো ও মন্দ দিক থাকে। চলুন এক নজরে দেখে নিই।
সুবিধা:
ভ্রমণ খরচ ও সময় সাশ্রয়: ভোট দিতে হাজার টাকা খরচ করে বাড়ি যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা: ভিড় এড়ানো যায়, যা বয়স্ক বা অসুস্থ কর্মকর্তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক।
অধিকার রক্ষা: কর্মক্ষেত্রে থেকেও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করা যায়।
অসুবিধা:
ডাক বিভাগের ওপর নির্ভরশীলতা: ডাক ব্যবস্থা যদি ধীরগতির হয়, তবে সময়মতো ব্যালট পৌঁছানো নিয়ে ঝুঁকি থাকে।
সত্যায়নের ঝামেলা: নতুন কোনো জায়গায় গেজেটেড অফিসার খুঁজে বের করে সত্যায়ন করাটা অনেকের কাছে বিব্রতকর মনে হতে পারে।
সচেতনতার অভাব: এখনো অনেকেই জানেন না কীভাবে সঠিক নিয়মে খাম প্রস্তুত করতে হয়।
(FAQ)
প্রশ্ন: আমি বেসরকারি চাকরি করি, ঢাকায় থাকি কিন্তু ভোটার রংপুরে। আমি কি এই অ্যাপে আবেদন করতে পারব?
উত্তর: দুঃখিত, বর্তমানে এই অ্যাপটি শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবী (iBAS++ ভুক্ত), নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং আনসার-ভিডিপি সদস্যদের জন্য। সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের এই সহজ ডিজিটাল সুবিধাটি এখনো চালু হয়নি।
প্রশ্ন: আমার ফোনে অ্যাপটি কাজ করছে না, কী করব?
উত্তর: সার্ভারে চাপের কারণে এমন হতে পারে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করুন। অথবা অ্যাপটি আপডেট আছে কি না চেক করুন। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকেও পিসির মাধ্যমে চেষ্টা করতে পারেন।
প্রশ্ন: ব্যালট পেপার কি আমার ইমেইলে আসবে?
উত্তর: না। ব্যালট পেপার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দলিল। ইহা ইমেইলে নয়, বরং হার্ডকপি আকারে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে আপনার দেওয়া ঠিকানায় পাঠানো হবে।
প্রশ্ন: আমি কি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়ে আবার কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারব?
উত্তর: একদম না! ইহা গুরুতর অপরাধ। আপনি যখন পোস্টাল ব্যালটের জন্য আবেদন করেন, তখন ভোটার লিস্টে আপনার নামের পাশে ‘PB’ (Postal Ballot) লিখে দেওয়া হয়। ফলে আপনি কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে চাইলে প্রিসাইডিং অফিসার আপনাকে আটকে দেবেন। দুইবার ভোট দেওয়ার চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রশ্ন: সত্যায়ন কি যেকোনো অফিসারকে দিয়ে করানো যাবে?
উত্তর: না, অবশ্যই তাকে ‘গেজেটেড অফিসার’ বা প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হতে হবে। যেমন—সরকারি কলেজের শিক্ষক, ডাক্তার, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা ইত্যাদি।
শেষ কথা:
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, আর নির্বাচন কমিশন সেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের পথকে সুগম করেছে। পোস্টাল ব্যালট এর মাধ্যমে দূরে থেকে ভোট দেওয়ার উপায় জানা থাকাটা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব।
আপনি যদি সরকারি চাকরি বা নির্বাচনী দায়িত্বের কারণে বাড়ি যেতে না পারেন, তবে দোহাই লাগে—ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন না। একটু সময় বের করে অ্যাপে নিবন্ধন করুন। হয়তো আপনার একটি ভোটেই নির্ধারিত হবে আপনার এলাকার উন্নয়ন, আপনার দেশের ভবিষ্যৎ।
মনে রাখবেন, গণতন্ত্রে কোনো অজুহাতের স্থান নেই। যেখানেই থাকুন, ভোট দিন। এই ব্লগ পোস্টটি যদি আপনার উপকারে আসে, তবে আপনার সহকর্মী বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, যারা হয়তো একই সমস্যায় ভুগছেন। নির্বাচনী প্রযুক্তি এবং জবের প্রস্তুতি নিয়ে আরও এমন ইনফরমেটিভ আর্টিকেল পড়তে আমাদের সাইট https://dailyictpost.com নিয়মিত ভিজিট করুন।
আপনার জন্য শুভকামনা এবং আগামী নির্বাচনের জন্য অগ্রিম অভিনন্দন!
দাবিত্যাগ (Disclaimer): এই আর্টিকেলে প্রদত্ত তথ্য বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রচলিত বিধিবিধান এবং সাম্প্রতিক অ্যাপ ইন্টারফেসের ওপর ভিত্তি করে লেখা। নির্বাচন কমিশন যেকোনো সময় তাদের নিয়মাবলী পরিবর্তন করার অধিকার রাখে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য সর্বদা নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা বিজ্ঞপ্তির ওপর নজর রাখুন।

Comments are closed.