আপনি থাকেন ঢাকায়, চাকরি বা ব্যবসা করেন সেখানেই। কিন্তু আপনার ভোটার আইডি কার্ডের ঠিকানা গ্রামের বাড়িতে। প্রতিবার ভোটের সময় একটা বড় ঝামেলায় পড়েন। ভোট দিতে গ্রামে যাবেন, নাকি শহরের জরুরি কাজ সামলাবেন? আবার অনেকেরই নতুন বিয়ে হয়েছে। স্বামী বা স্ত্রীর হাত ধরে প্রথমবার ভোট দিতে যাবেন, কিন্তু দুজনের কেন্দ্র দুই জেলায়। এখন কি করবেন?
এই সমস্যাগুলো খুবই সাধারণ। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির এই হাই ভোল্টেজ নির্বাচনের আগে এই “সাধারণ” সমস্যাটিই আপনার জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
আপনি হয়তো ভাবছেন, “ভোটের তো এখনো প্রায় ৫০ দিন বাকি। হাতে সময় আছে, পরে একসময় কেন্দ্র বদলে নেব।”
সাবধান! এখানেই ৯৯% মানুষ ভুল করে থাকেন। নির্বাচন কমিশন কিন্তু ভোটার এলাকা পরিবর্তনের জন্য অনির্দিষ্টকাল সময় দেয় না। একটা শেষ সময়সীমা আছে, যা অনেকেই জানেন না এবং শেষ মুহূর্তে দৌড়াদৌড়ি করে ব্যর্থ হন।
চলুন, জেনে নিই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ আপনার ভোট কেন্দ্র পরিবর্তন করবেন কিভাবে?

ভোট কেন্দ্র পরিবর্তন করার শেষ সময়সীমা কোনটি?
বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, ভোটের আগের সপ্তাহ পর্যন্ত বুঝি ভোট কেন্দ্র পরিবর্তন করা যায়। ইহা একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

নির্বাচন কমিশনের কঠোর আইন বা আরপিও (RPO) অনুযায়ী নিয়ম হলো- জাতীয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল (Election Schedule) ঘোষণা হয়ে গেলে আর কোনোভাবেই ভোটার এলাকা পরিবর্তন বা স্থানান্তর করা যায় না। (গতকাল ২০ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সংশোধিত তফসিল প্রকাশ করা হয়েছে।)
উদাহরণ: ইহা হলো ট্রেনের মতো। তফসিল ঘোষণা হলো ট্রেনের হুইসেল। হুইসেল বেজে গেলে যেমন আর ট্রেনে ওঠা যায় না, তেমনই তফসিল ঘোষণার পর আর ভোটার এলাকা বদলানো যায় না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণত নির্বাচনের ৪০-৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা হয় (যা ইতিমধ্যে ঘোষিত হয়ে গেছে)।
কেন্দ্র বদলাতে কি কি লাগবে?
আপনার ভোট কেন্দ্র পরিবর্তন করা খুব রকেট সায়েন্স নয়। এর জন্য আপনাকে শুধু প্রমাণ করতে হবে যে আপনি বর্তমানে নতুন জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। কিন্তু সমস্যা হয় ডকুমেন্ট জোগাড় কোঁড়তে। অফিসাররা কোন ডকুমেন্ট দেখে সন্তুষ্ট হন, তা জানা জরুরি।
আপনার ভোট কেন্দ্র পরিবর্তন নিচের ডকুমেন্টগুলো গুছিয়ে নিন:

১. আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র/ এনআইডি কার্ডের ফটোকপি।
২. নতুন ঠিকানার প্রমাণপত্র (যেকোনো একটি):
- সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হলো আপনার নিজের বা বাবা/স্বামীর নামের সর্বশেষ বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির বিলের কপি।
- নিজস্ব বাড়ি হলে বাড়ির ট্যাক্স বা চৌকিদারি ট্যাক্সের হালনাগাদ রসিদ।
- যদি ভাড়াটিয়া হোন, তবে বাড়িভাড়ার চুক্তিনামা এবং সাথে বাড়িওয়ালার এনআইডি কার্ডের ফটোকপি ও তার বিদ্যুৎ বিলের কপি। (শুধু ভাড়ার চুক্তি অনেক সময় মানতে চায় না)।
৩. নাগরিকত্ব সনদ: আপনি বর্তমানে যে এলাকায় থাকেন, সেই এলাকার কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নেওয়া নাগরিকত্ব বা চারিত্রিক সনদপত্র। সনদে অবশ্যই আপনার বর্তমান ঠিকানা উল্লেখ থাকতে হবে।
ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য আবেদন করার নিয়ম (ফর্ম-১৩ এর ব্যবহার)
ভোটার এলাকা স্থানান্তরের কাজটি অনলাইনে পুরোপুরি করা যায় না। এর জন্য আপনাকে সশরীরে নতুন এলাকার নির্বাচন অফিসে যেতে হবে। একে বলা হয় “অফলাইন পদ্ধতি”। ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনে আবেদন করতে ফর্ম-১৩ এর ব্যবহার করতে হবে।


ধাপ ১: সঠিক অফিসে যাওয়া
আপনি যে নতুন এলাকায় ভোট স্থানান্তর করতে চান, সেই এলাকার উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যেতে হবে। পুরোনো এলাকার অফিসে গেলে হবে না।
ধাপ ২: ফর্ম-১৩ সংগ্রহ ও পূরণ
অফিস থেকে “ফর্ম-১৩” (ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদন ফর্ম) বিনামূল্যে সংগ্রহ করুন। ফর্মটি সতর্কতার সাথে পূরণ করুন। আপনার বর্তমান ও পুরাতন ঠিকানা সঠিকভাবে লিখুন।
ধাপ ৩: জমা ও যাচাই
ওপরের চেকলিস্ট অনুযায়ী সব ডকুমেন্ট ফর্মের সাথে পিনআপ করে উপজেলা নির্বাচন অফিসারের কাছে জমা দিন। অফিসার আপনার কাগজপত্র যাচাই করবেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিল এবং নাগরিকত্ব সনদ তারা ভালো করে দেখেন। সব ঠিক থাকলে তিনি আপনার আবেদন গ্রহণ করবেন এবং আপনাকে একটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্র (Acknowledgement Slip) দেবেন।
“ডুয়েল ভোটার” হওয়ার ফাঁদে পা দেবেন না
অনেকে একটু বেশি চালাকি করতে গিয়ে ভাবেন, “গ্রামের নামটাও থাকুক, শহরেও নাম থাকুক। সুযোগ বুঝে দুই জায়গায় ভোট দেওয়া যাবে।”
খবরদার! এই কাজ ভুলেও করবেন না। এখন সব ডিজিটাল। নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে আপনার আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিস নেওয়া আছে। আপনি যখনই নতুন ঠিকানায় ভোটার হওয়ার আবেদন করবেন এবং তা গৃহীত হবে, সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার পুরোনো ঠিকানার নাম কেটে দেবে।
আর যদি কোনোভাবে তথ্য গোপন করে নতুন করে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করেন এবং ধরা পড়েন, তবে আপনার দুটি এনআইডি-ই বাতিল হতে পারে এবং আপনার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও হতে পারে। তাই সৎ থাকুন, এক জায়গায় ভোটার হোন।
ভোট আপনার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হলে আপনাকে সঠিক কেন্দ্রে থাকতে হবে। আলসেমি করে শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করবেন না। আজই কাগজপত্র গুছিয়ে কালই নির্বাচন অফিসে চলে যান। মনে রাখবেন, তফসিল ঘোষণার ঘণ্টা কিন্তু যেকোনো সময় বেজে উঠতে পারে।
Please don’t forget to leave a review of my article

Comments are closed.